বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে চরম অস্থিরতা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে মাঠে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ‘জাতীয় শ্রমিক লীগ’-এর পদধারী ব্যক্তিদের কমিটিতে পুনর্বাসন এবং এর নেপথ্যে বড় অঙ্কের ‘পদ বাণিজ্যের’ গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে বড় রহস্য তৈরি হয়েছে স্বয়ং সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইনের স্বাক্ষর নিয়ে। প্রথমে নিজের সইকে ‘অবৈধ ও বাতিল’ ঘোষণা করে জরুরি বিজ্ঞপ্তি এবং মাত্র ছয় দিনের মাথায় কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের ঘটনা সাংগঠনিক পরিমণ্ডলে নজিরবিহীন নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে।
মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ-এর প্রধান কার্যালয় এবং সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে নেতাকর্মীদের মাঝে চাপা ক্ষোভ ও থমথমে পরিস্থিতি। সাধারণ কর্মচারীদের একাংশ এবং দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা এই কমিটিকে সরাসরি ‘পকেট কমিটি’ ও ‘সুবিধাবাদীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
কার্যালয়ের করিডোরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রবীণ কর্মচারী বলেন:
"বিগত ১৫ বছর যারা হামলা, মামলা ও বরখাস্তের শিকার হয়ে বিআইডব্লিউটিএ থেকে বিতাড়িত ছিল, তাদের কোনো মূল্যায়ন নেই। অথচ বিগত সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী শ্রমিক লীগের সাবেক নেতারা রাতারাতি বনে গেছেন শ্রমিক দলের শীর্ষ কাণ্ডারি। এটা দলের তৃণমূলের পিঠে সরাসরি ছুরিকাঘাত।"
সাধারণ শ্রমিকদের অভিযোগ, নতুন এই কমিটিকে কেন্দ্র করে সংস্থাটির ভেতরে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং যে কোনো সময় পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কমিটি অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াতেই রয়েছে বড় ধরনের নাটকীয়তা ও অসঙ্গতি। শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় প্যাডে গত ১ সেপ্টেম্বর সভাপতি আনোয়ার হোসাইনের সই করা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিআইডব্লিউটিএ ইউনিট কমিটি অনুমোদনে তাঁর স্বাক্ষরের অপব্যবহার করা হয়েছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট স্বাক্ষরটি ‘বাতিল ও অকার্যকর’ বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে মাত্র ছয় দিনের মাথায়, অর্থাৎ ৭ সেপ্টেম্বর আরেকটি সংশোধিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগের বিজ্ঞপ্তিটি ‘প্রত্যাহার’ করে নেওয়া হয়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সভাপতির এমন ১৮০ ডিগ্রি অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে সংগঠনের ভেতর নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলছে।
কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত বিতর্কিত ব্যক্তিদের পূর্ববর্তী সাংগঠনিক পরিচয় ঘেঁটে দেখা যায়, বর্তমান কমিটির পদপ্রত্যাশী ও অন্তর্ভুক্ত বেশ কয়েকজন অতীতে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। পুরোনো নথিপত্র অনুযায়ী মাজহারুল ইসলাম, শাহিন উদ্দিন খান ও জিয়াদ উদ্দীন বিভিন্ন সময় শ্রমিক লীগের নানা পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সক্রিয় নেতাদের কোনো ধরনের সাংগঠনিক তদন্ত ছাড়াই রাতারাতি কীভাবে এই ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো হলো, তা নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ জুড়ে চলছে তীব্র সমালোচনা।
এদিকে পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে একটি মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই কমিটিতে পদ বাণিজ্য করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কিছু ব্যক্তিকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে এই অনুমোদন নিশ্চিত করা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকিং প্রমাণ প্রকাশ্যে না এলেও, সভাপতির স্বাক্ষরের বৈধতা নিয়ে সৃষ্ট নাটকীয়তা ও সমঝোতার গতিপ্রকৃতি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগকে আরও ঘনীভূত করেছে। ফলে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা অবিলম্বে এই বিতর্কিত কমিটি বাতিল করে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বশীল এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিআইডব্লিউটিএ ইউনিটের কমিটি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অবগত এবং বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মতামত