ঢাকা    রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
আইন দর্পণ

দলীয় পরিচয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকার কতটা কঠোর?


| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

দলীয় পরিচয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকার কতটা কঠোর?
বিএনপির লোগো

একদিকে অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ও রাজনৈতিক পরিচয় না দেখার ঘোষণা, অন্যদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানী ও আশপাশে দখল, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের একাধিক ঘটনা। এর কয়েকটিতে ক্ষমতাসীন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নাম আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা কঠোর হতে পারছে?

মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও পরে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে জমি দখলের অভিযোগে হামলা, আদাবরে একটি ভবন দখলের চেষ্টা এবং ইসিবি চত্বরে একটি আবাসন প্রকল্প ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা ঘটে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে। এর বাইরে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় স্থানীয় বিএনপির এক নেতাসহ ৭৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ঘটনায় রাজনৈতিকভাবে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নাম এসেছে, যদিও অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের তদন্ত বা অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, সেই আলোচনাও সামনে এসেছে।

একদিকে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা, অন্যদিকে সহিংসতা অব্যাহত

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনার সুযোগ নেই। গত ১ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধ ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকিরও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একই নির্দেশ দিয়ে বলেন, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় হচ্ছে সে অপরাধী।

তবে সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান বলছে, রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে, সেপ্টেম্বরে দেশে ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় চারজন নিহত এবং ৫২৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৩৫টি ঘটনায় একজন নিহত ও অন্তত ৩৪০ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াতের সাতটি সংঘর্ষে ৬১ জন, বিএনপি-আওয়ামী লীগের ছয়টি ঘটনায় ৪২ জন আহত এবং একজন নিহত হন। জামায়াত-আওয়ামী লীগের দুটি ঘটনায় একজন নিহত হন। আগস্টে ৭০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সাতজন নিহত ও ৫৩৬ জন আহত হয়েছিলেন।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, অন্তঃকোন্দল এবং চাঁদাবাজি এসব সংঘাতের অন্যতম কারণ। সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক, যৌথ ও বিশেষ অভিযানে ২৮৭টি ঘটনায় অন্তত ২১ হাজার ২০৮ জনকে গ্রেফতারের তথ্যও দিয়েছে এইচআরএসএস। একই মাসে ৩৫টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) পর্যবেক্ষণে সেপ্টেম্বরে ৬৫টি মব সহিংসতার ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৭৪ জন আহত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৭১টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার এবং কারা হেফাজতে ২৪ জনের মৃত্যুর তথ্যও দিয়েছে সংস্থাটি। 

অপরাধ মোকাবিলায় তিন ধাপের পরিকল্পনা

সহিংস অপরাধ, কিশোর গ্যাং, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র ও ডিজিটাল জালিয়াতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অপরাধের তথ্য পর্যালোচনা করে তিন ধাপের পরিকল্পনা তৈরি করেছে তারা।

পুলিশের ওই পর্যালোচনা অনুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে ৯ হাজার ১৭৮টি চুরি, ২ হাজার ৭৩৩টি ডাকাতি, ১ হাজার ৩৩৩টি ছিনতাই এবং ৪৪৫টি দস্যুতার মামলা হয়। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ব্যবহার করে ১ হাজার ১০৬টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ২৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে অপহরণের মামলা হয়েছে ৩ হাজার ১১২টি।

পরিকল্পনার প্রথম ধাপে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর টহল ও টার্গেটেড অভিযান, বডি ক্যামেরা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৯৯৯ ও অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জেলা ও মহানগরে সাইবার অপরাধ ইউনিট তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। তৃতীয় ধাপে অপরাধপ্রবণ এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল তদন্ত মনিটরিং ব্যবস্থা এবং থানার অপারেশন ও তদন্ত কার্যক্রম আলাদা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

‘সরকারদলীয় হলেও অপরাধ করলে আটক হবে’

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কতটা কঠোর এবং ক্ষমতাসীন দলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুলিশের ভূমিকা কী হবে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি সাইদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশে অপরাধ নতুন নয় এবং অপরাধের ধরন ও মাত্রাও সমাজভেদে আলাদা। বাড়িঘর বা সম্পত্তি দখল, আক্রমণ কিংবা দলবদ্ধভাবে বেআইনি কর্মকাণ্ড, সবই প্রচলিত আইনে অপরাধ। তিনি বলেন, ‘আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ সব সময়ই কঠোর। তবে সেই কঠোরতা যেন অমানবিক না হয় এবং মানবাধিকার যেন লঙ্ঘিত না হয়, সেটিও আমাদের দেখতে হয়।’

সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের নাম বিভিন্ন ঘটনায় আসার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ যখন বেআইনি বা জনশৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করে, তখন সে সরকারদলীয়, বিরোধীদলীয় বা নিরপেক্ষ, সেটা বিবেচনার সুযোগ পুলিশের নেই। অভিযোগ এলে পুলিশ তদন্ত করবে এবং তদন্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারদলীয় বলে কাউকে ছাড় দেওয়ার বিধান আইনে নেই এবং পুলিশও তা করে না। সরকারদলীয় লোকজনকেও আটক করা হয়েছে। অপরাধ করলে তো আটক হবেই। সরকারদলের কোনো ব্যক্তিকে অপরাধ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল যখন সরকারে থাকে, তখন সেই দলেরও দায়িত্ব থাকে নিজেদের নেতাকর্মীদের পরিষ্কার বার্তা দেওয়া যে উচ্ছৃঙ্খলতা বা বেআইনি কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। বর্তমান সরকারদলও তাদের নেতাকর্মীদের সেই বার্তা দিচ্ছে।

আর পুলিশের ক্ষেত্রে এটি একটি স্থায়ী নীতি। কেউ বেআইনি কাজ করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। বর্তমান সরকারও কোথাও পুলিশকে বলেনি যে তাদের দলের কোনো কর্মীকে ধরা যাবে না।

রাড্ডার পর দৃশ্যমান দলীয় ব্যবস্থা

মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের পর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের তিনটি কমিটি বিলুপ্ত এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দলীয় বিজ্ঞপ্তিগুলোতে রাড্ডার ঘটনাকে সরাসরি এসব সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বহিষ্কারের ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

এছাড়াও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ১ অক্টোবর সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। রাড্ডার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন এবং বিষয়টি তদন্তাধীন।

এসব ঘটনার বিষয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজনের সঙ্গে সম্প্রতি আলাপকালে তারা জানিয়েছিলেন, এসব পদক্ষেপ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেওয়া হচ্ছে না। এর উদ্দেশ্য সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। তাদের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল বার্তা হলো, দলের নামে অপরাধ করে কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবিধা নিতে পারবেন না।

তারা সেসময় আরও জানান, রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; এ বিষয়টি দল স্পষ্ট করতে চায়। একই সময়ে সরকারও যখন বলছে, কোনও অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না, তখন দলের সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় আইনের প্রয়োগও একই ধরনের কঠোর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও কয়েকটি বিষয়ে অবনতি হয়েছে। মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন-কেন্দ্রিক সহিংসতা, ক্যাম্পাসে সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, কারাগারে মৃত্য, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনার ধারাবাহিকতা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গত ৩০ সেপ্টেম্বর বলেছিলেন, ‘জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রকৃত কর্মীরা কখনও চাঁদাবাজি বা জমি দখলের সঙ্গে জড়িত হতে পারেন না। দলের নাম ব্যবহার করে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হবে, বিএনপি তাদের কাউকে ছাড়বে না। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান শনিবার (৩ অক্টোবর) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চেষ্টা করছেন। সরকারে থাকা দলের নাম ব্যবহার করে কিছু সুযোগসন্ধানী অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যারা অপরাধে জড়িয়েছে, কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।’

শীর্ষ অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকার কবে আরও কঠোর অবস্থানে যাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে জিরো টলারেন্সে নীতি গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।’

বিষয় : বিএনপি

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

আইন দর্পণ

রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬


দলীয় পরিচয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকার কতটা কঠোর?

প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

একদিকে অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ও রাজনৈতিক পরিচয় না দেখার ঘোষণা, অন্যদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানী ও আশপাশে দখল, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের একাধিক ঘটনা। এর কয়েকটিতে ক্ষমতাসীন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নাম আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা কঠোর হতে পারছে?

মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও পরে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে জমি দখলের অভিযোগে হামলা, আদাবরে একটি ভবন দখলের চেষ্টা এবং ইসিবি চত্বরে একটি আবাসন প্রকল্প ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা ঘটে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে। এর বাইরে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় স্থানীয় বিএনপির এক নেতাসহ ৭৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ঘটনায় রাজনৈতিকভাবে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নাম এসেছে, যদিও অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের তদন্ত বা অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, সেই আলোচনাও সামনে এসেছে।

একদিকে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা, অন্যদিকে সহিংসতা অব্যাহত

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনার সুযোগ নেই। গত ১ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধ ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকিরও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একই নির্দেশ দিয়ে বলেন, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় হচ্ছে সে অপরাধী।

তবে সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান বলছে, রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে, সেপ্টেম্বরে দেশে ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় চারজন নিহত এবং ৫২৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৩৫টি ঘটনায় একজন নিহত ও অন্তত ৩৪০ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াতের সাতটি সংঘর্ষে ৬১ জন, বিএনপি-আওয়ামী লীগের ছয়টি ঘটনায় ৪২ জন আহত এবং একজন নিহত হন। জামায়াত-আওয়ামী লীগের দুটি ঘটনায় একজন নিহত হন। আগস্টে ৭০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সাতজন নিহত ও ৫৩৬ জন আহত হয়েছিলেন।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, অন্তঃকোন্দল এবং চাঁদাবাজি এসব সংঘাতের অন্যতম কারণ। সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক, যৌথ ও বিশেষ অভিযানে ২৮৭টি ঘটনায় অন্তত ২১ হাজার ২০৮ জনকে গ্রেফতারের তথ্যও দিয়েছে এইচআরএসএস। একই মাসে ৩৫টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) পর্যবেক্ষণে সেপ্টেম্বরে ৬৫টি মব সহিংসতার ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৭৪ জন আহত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৭১টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার এবং কারা হেফাজতে ২৪ জনের মৃত্যুর তথ্যও দিয়েছে সংস্থাটি। 

অপরাধ মোকাবিলায় তিন ধাপের পরিকল্পনা

সহিংস অপরাধ, কিশোর গ্যাং, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র ও ডিজিটাল জালিয়াতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অপরাধের তথ্য পর্যালোচনা করে তিন ধাপের পরিকল্পনা তৈরি করেছে তারা।

পুলিশের ওই পর্যালোচনা অনুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে ৯ হাজার ১৭৮টি চুরি, ২ হাজার ৭৩৩টি ডাকাতি, ১ হাজার ৩৩৩টি ছিনতাই এবং ৪৪৫টি দস্যুতার মামলা হয়। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ব্যবহার করে ১ হাজার ১০৬টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ২৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে অপহরণের মামলা হয়েছে ৩ হাজার ১১২টি।

পরিকল্পনার প্রথম ধাপে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর টহল ও টার্গেটেড অভিযান, বডি ক্যামেরা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৯৯৯ ও অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জেলা ও মহানগরে সাইবার অপরাধ ইউনিট তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। তৃতীয় ধাপে অপরাধপ্রবণ এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল তদন্ত মনিটরিং ব্যবস্থা এবং থানার অপারেশন ও তদন্ত কার্যক্রম আলাদা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

‘সরকারদলীয় হলেও অপরাধ করলে আটক হবে’

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কতটা কঠোর এবং ক্ষমতাসীন দলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুলিশের ভূমিকা কী হবে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি সাইদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশে অপরাধ নতুন নয় এবং অপরাধের ধরন ও মাত্রাও সমাজভেদে আলাদা। বাড়িঘর বা সম্পত্তি দখল, আক্রমণ কিংবা দলবদ্ধভাবে বেআইনি কর্মকাণ্ড, সবই প্রচলিত আইনে অপরাধ। তিনি বলেন, ‘আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ সব সময়ই কঠোর। তবে সেই কঠোরতা যেন অমানবিক না হয় এবং মানবাধিকার যেন লঙ্ঘিত না হয়, সেটিও আমাদের দেখতে হয়।’

সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের নাম বিভিন্ন ঘটনায় আসার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ যখন বেআইনি বা জনশৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করে, তখন সে সরকারদলীয়, বিরোধীদলীয় বা নিরপেক্ষ, সেটা বিবেচনার সুযোগ পুলিশের নেই। অভিযোগ এলে পুলিশ তদন্ত করবে এবং তদন্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারদলীয় বলে কাউকে ছাড় দেওয়ার বিধান আইনে নেই এবং পুলিশও তা করে না। সরকারদলীয় লোকজনকেও আটক করা হয়েছে। অপরাধ করলে তো আটক হবেই। সরকারদলের কোনো ব্যক্তিকে অপরাধ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল যখন সরকারে থাকে, তখন সেই দলেরও দায়িত্ব থাকে নিজেদের নেতাকর্মীদের পরিষ্কার বার্তা দেওয়া যে উচ্ছৃঙ্খলতা বা বেআইনি কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। বর্তমান সরকারদলও তাদের নেতাকর্মীদের সেই বার্তা দিচ্ছে।

আর পুলিশের ক্ষেত্রে এটি একটি স্থায়ী নীতি। কেউ বেআইনি কাজ করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। বর্তমান সরকারও কোথাও পুলিশকে বলেনি যে তাদের দলের কোনো কর্মীকে ধরা যাবে না।

রাড্ডার পর দৃশ্যমান দলীয় ব্যবস্থা

মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের পর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের তিনটি কমিটি বিলুপ্ত এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দলীয় বিজ্ঞপ্তিগুলোতে রাড্ডার ঘটনাকে সরাসরি এসব সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বহিষ্কারের ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।

এছাড়াও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ১ অক্টোবর সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। রাড্ডার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন এবং বিষয়টি তদন্তাধীন।

এসব ঘটনার বিষয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজনের সঙ্গে সম্প্রতি আলাপকালে তারা জানিয়েছিলেন, এসব পদক্ষেপ কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেওয়া হচ্ছে না। এর উদ্দেশ্য সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। তাদের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল বার্তা হলো, দলের নামে অপরাধ করে কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবিধা নিতে পারবেন না।

তারা সেসময় আরও জানান, রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; এ বিষয়টি দল স্পষ্ট করতে চায়। একই সময়ে সরকারও যখন বলছে, কোনও অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না, তখন দলের সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় আইনের প্রয়োগও একই ধরনের কঠোর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও কয়েকটি বিষয়ে অবনতি হয়েছে। মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন-কেন্দ্রিক সহিংসতা, ক্যাম্পাসে সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, কারাগারে মৃত্য, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনার ধারাবাহিকতা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গত ৩০ সেপ্টেম্বর বলেছিলেন, ‘জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রকৃত কর্মীরা কখনও চাঁদাবাজি বা জমি দখলের সঙ্গে জড়িত হতে পারেন না। দলের নাম ব্যবহার করে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হবে, বিএনপি তাদের কাউকে ছাড়বে না। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান শনিবার (৩ অক্টোবর) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চেষ্টা করছেন। সরকারে থাকা দলের নাম ব্যবহার করে কিছু সুযোগসন্ধানী অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যারা অপরাধে জড়িয়েছে, কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।’

শীর্ষ অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকার কবে আরও কঠোর অবস্থানে যাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে জিরো টলারেন্সে নীতি গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।’


আইন দর্পণ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: গোলাম মোস্তফা 

কপিরাইট © ২০২৬ আইন দর্পণ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
দলীয় পরিচয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকার কতটা কঠোর?
0:00 0:00
1.0x