ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চলতি বছরের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৩ হাজার ৮৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ২ হাজার ১৮১ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ ছাড়া ৫৭৯ জন নিজ দায়িত্বে হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন।
শনিবার সরেজমিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৪০২, ৫০২ ও ৭০২ নম্বর ওয়ার্ড নির্ধারিত রয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের এসব ডেডিকেটেড ওয়ার্ডেই ভর্তি করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও তাদের সঙ্গে থাকা স্বজন বা অ্যাটেনডেন্টের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক রোগীকে মশারি সরবরাহ করলেও নানা কারণে অনেক রোগী ও তাদের স্বজন মশারি ব্যবহার করছেন না।
গাজীপুর থেকে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা নিতে আসা ১৮ বছর বয়সী ফারহান জানান, “আমরা গাজীপুর থাকি সেখানে বেশ কয়েকদিন জ্বর থাকার পরে গাজীপুর হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম সেখান থেকে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় ঢাকা মেডিকেলে রেফার করে।এখন আগের থেকে একটু ভালো আছি।
হাসপাতালে এসেছেন আপনাদের এখানে মশারি সাপ্লাই দেওয়া হয়েছে কিন্তু আপনারা কেন মশারি টানাচ্ছেন না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,হাসপাতাল দেশের থেকে মশারি দিয়েছে ঠিকই কিন্তু টানানোর ব্যবস্থা পাচ্ছিনা।
নতুন ভবনের ওয়ার্ড মাস্টার রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ডগুলোতে সবার জন্য মশারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তারা মশারি ব্যবহার করছেন না। এতে তাদের সঙ্গে থাকা অ্যাটেনডেন্টরাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা গত দুই বছরের তুলনায় কম। ২০২৫ সালে ঢামেকে ডেঙ্গুতে ১১৮ জন এবং ২০২৪ সালে ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অর্থাৎ, গত দুই বছরে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে মোট ২১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ঢামেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অক্টোবরের প্রথম তিন দিনেই ভর্তি হয়েছেন ১২৭ জন। একই সময়ে ৬৬ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং ৩১ জন নিজ দায়িত্বে হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন। এ ছাড়া ৪০২ ও ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে দুজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।এ নিয়ে চলতি বছরের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ঢামেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৩ হাজার ৮৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
ঢামেকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর ভর্তি তুলনামূলক কম ছিল। জানুয়ারিতে ৪৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৬, মার্চে ৩০, এপ্রিলে ৪১, মে মাসে ৭৫ এবং জুনে ১২২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন।
চলতি বছর এ পর্যন্ত জানুয়ারিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে কোনো মৃত্যু হয়নি। মার্চে দুজন, এপ্রিলে কেউ মারা যাননি, মে মাসে দুজন, জুনে একজন, জুলাইয়ে ১০ জন, আগস্টে ১০ জন, সেপ্টেম্বরে ১৩ জন এবং অক্টোবরের প্রথম তিন দিনে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে ১০ জন করে মারা গেছেন।
২০২৫ সালে ঢামেকে ডেঙ্গুতে মোট ১১৮ জন এবং ২০২৪ সালে ৯৫ জনের মৃত্যু হয়। তিন বছরের মাসভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সর্বোচ্চ ২৫ জন এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে ২৪ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছিল।
বর্তমানে ঢামেকে মোট ২৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪১ জন পুরুষ, ৮৯ জন নারী এবং ৬৮ জন শিশু।
ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে কি না এবং বর্তমানে রোগীদের পরিস্থিতি কেমন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, ডেঙ্গু রোগীসংক্রান্ত সব তথ্য দেওয়ার জন্য পরিচালক ডা. আশরাফুল আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে উপ-পরিচালক আশরাফুল ইসলামের কাছ থেকে বিস্তারিত জানা যাবে বলেও জানান তিনি।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য জানতে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আশরাফুল আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মতামত