রাজধানীর গুলিস্তানের ব্যস্ততম কোলাহলে ১৯৯৭ সালে যখন ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০০ আসনের মহানগর নাট্যমঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন লক্ষ্য ছিল এটি হবে নগরবাসীর সাংস্কৃতিক আলোকবর্তিকা। কিন্তু দীর্ঘ ২৯ বছর পর সরেজমিন অনুসন্ধানে সেই স্বপ্নের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি; সংস্কৃতির তীর্থভূমি হয়ে ওঠার পরিবর্তে কাজী বশির মিলনায়তন খ্যাত এই স্থাপনাটি এখন রূপ নিয়েছে রাজধানীর এক দুর্ধর্ষ ‘ক্রাইম জোনে’। অযত্ন, অবহেলা, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং সংস্কৃতিচর্চার তীব্র সংকটে পড়ে রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি আজ তার মূল উদ্দেশ্য থেকে পুরোপুরি বিচ্যুত।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাতের আঁধার তো বটেই, খোদ দিনের আলোতেই নাট্যমঞ্চ ও এর আশপাশের চত্বর মাদকসেবী, ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। মূল ভবনের দেওয়ালে হেলান দিয়ে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের দৃশ্য এখানে নিত্যদিনের চিত্র। অনতিদূরেই পথচারীদের চিৎকার, ছিনতাইকারীর দৌড়ে পালানোর ঘটনা ঘটলেও মিলনায়তন সংলগ্ন পার্কে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কোনো বালাই নেই। সম্প্রতি ঘুরতে এসে মোবাইল ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া এক পথচারীর ঘটনা তারই প্রমাণ দেয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকারদের ভাষ্যমতে, এলাকাটি প্রকাশ্য অপরাধীদের অভয়ারণ্য হলেও সেখানে পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো দৃশ্যমান নজরদারি বা উপস্থিতি নেই, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
নাট্যকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে নির্মিত এই মিলনায়তন থেকে কেন সংস্কৃতিকর্মীরা মুখ ফিরিয়ে নিলেন—তার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সমাজকল্যাণ বিভাগের চরম অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার চিত্র। মিলনায়তন প্রাঙ্গণে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, কৃত্রিম জলাধারে জমে থাকা দুর্গন্ধযুক্ত পানি, ভবঘুরেদের অবাধ বিচরণ এবং নিরাপত্তাহীনতাই নাট্যকর্মীদের অনাগ্রহের মূল কারণ। এর ওপর মিলনায়তনের ভেতরের শব্দব্যবস্থা (অ্যাকোস্টিক) নাটক মঞ্চায়নের একেবারেই অনুপযোগী। অভিযোগ রয়েছে, নাটক মঞ্চায়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরির চেয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি, বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান ও সভা-সমাবেশের জন্য মিলনায়তনটি চড়া মূল্যে ভাড়া দেওয়াতেই কর্তৃপক্ষের আগ্রহ বেশি। ফলে শিল্পচর্চার জায়গাটি ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে।
বাংলাদেশ থিয়েটারের অধিকর্তা খন্দকার শাহ আলম ও বিবেকানন্দ থিয়েটারের শুভাশিস দত্ত তন্ময়সহ নাট্যসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো নাট্যদলের পক্ষে এমন প্রতিকূল ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে নাটক মঞ্চায়ন করা অসম্ভব। আধুনিক শব্দ ও আলোকব্যবস্থার অভাব, ভাঙাচোরা দর্শক আসন, অতিরিক্ত হলভাড়া এবং নিয়মিত প্রদর্শনীর কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় নাট্যদলগুলো এই মঞ্চ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। তাঁদের মতে, মিলনায়তনটি সার্বক্ষণিক নাট্যচর্চা ও মহড়ার জন্য উন্মুক্ত রাখা গেলে অপরাধীরা কখনোই এখানে শেকড় গাড়তে পারত না; অর্থাৎ সাংস্কৃতিক শূন্যতাই অপরাধের পথ প্রশস্ত করেছে।
নাট্য গবেষক ও সমালোচকদের মতে, সংকট থেকে উত্তরণের পথটি দীর্ঘদিন আগেই চিহ্নিত হয়েছিল—সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে এটিকে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই প্রস্তাবটি আজও ফাইলবন্দি হয়ে আছে। নাট্যকার অপূর্ব কুমার কুণ্ডু যেমনটি স্পষ্ট করেছেন, যেখানে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, সেখানে অপরাধ টিকে থাকতে পারে না। তাই কালবিলম্ব না করে মহানগর নাট্যমঞ্চকে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের আওতায় এনে শিল্পকলা একাডেমির কাছে হস্তান্তর করাই এখন একমাত্র কার্যকর সমাধান; অন্যথায় রাষ্ট্রীয় অর্থে গড়ে ওঠা এই সাংস্কৃতিক সম্পদ চিরতরে অপরাধীদের দখলে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
মতামত