বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর তালিকায় এখন অসংক্রামক রোগের আধিপত্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৩ সালে বিশ্বের মোট ৬ কোটি ১০ লাখ মৃত্যুর মধ্যে ৩ কোটি ৩০ লাখ, অর্থাৎ প্রায় ৫৪ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল শীর্ষ ১০টি কারণ।
২ অক্টোবর প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর ‘দ্য টপ ১০ কজেস অব ডেথ’ প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের বৈশ্বিক মৃত্যুর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, শীর্ষ ১০ মৃত্যুর কারণের আটটিই অসংক্রামক রোগ।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজে। ২০২৩ সালে এ রোগে প্রায় ৯৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর ১৬ শতাংশ। ২০০০ সালের তুলনায় এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ৩০ লাখ।
মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ স্ট্রোক। ২০২৩ সালে এতে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ১১ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি)। এ রোগে মারা গেছে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ।
চতুর্থ প্রধান কারণ নিম্ন শ্বাসনালীর সংক্রমণ। ২০২৩ সালে এ রোগে ২৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব কমে আসায় রোগটি আবার বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগে পরিণত হয়েছে। এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৯ সালের মহামারিপূর্ব পর্যায়েও ফিরে গেছে।
পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে আলঝেইমার রোগ ও অন্যান্য ডিমেনশিয়া। ২০২৩ সালে এসব রোগে ২১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বিশ্বব্যাপী আলঝেইমার ও অন্যান্য ডিমেনশিয়ায় মৃত্যুর ৬৬ শতাংশই নারী।
ষষ্ঠ প্রধান মৃত্যুর কারণ ডায়াবেটিস। ২০২৩ সালে এ রোগে প্রায় ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০০০ সালের তুলনায় ডায়াবেটিসে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
সপ্তম অবস্থানে রয়েছে শ্বাসনালি, ব্রঙ্কাস ও ফুসফুসের ক্যানসার। ২০০০ সালে এ রোগে ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখে।
অষ্টম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগ। এরপর নবম অবস্থানে রয়েছে কিডনি রোগ। ২০০০ সালে বিশ্বে মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগের অবস্থান ছিল ১৭তম। ২০২৩ সালে তা উঠে এসেছে নবম অবস্থানে। এ সময়ে কিডনি রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ৮৬ শতাংশ।
দশম অবস্থানে রয়েছে ডায়রিয়াজনিত রোগ।
বদলে গেছে মৃত্যুর ধরন
ডব্লিউএইচওর তথ্য বলছে, গত দুই দশকে বিশ্বে মৃত্যুর ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০০০ সালে শীর্ষ ১০ মৃত্যুর কারণের তালিকায় থাকা এইচআইভি/এইডস এখন আর সেই তালিকায় নেই। ২০০০ সালে বিশ্বের মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ ছিল এইচআইভি/এইডস। ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে ২২তম অবস্থানে। এ সময়ে এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে ৬২ শতাংশ।
অন্যদিকে কিডনি রোগের মতো কিছু অসংক্রামক রোগের প্রভাব বেড়েছে। একই সময়ে ফুসফুসের ক্যানসার ও ডায়াবেটিসেও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কোভিড-১৯ও ২০২৩ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০ মৃত্যুর কারণের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। মহামারির তীব্র সময়ে ২০২০ সালে কোভিড-১৯ সরাসরি প্রায় ৫৩ লাখ এবং ২০২১ সালে ৯৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল। ২০২৩ সালে সরাসরি কোভিড-১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যা কমে প্রায় ৯ লাখে দাঁড়ায়। ফলে বিশ্বে মৃত্যুর কারণ হিসেবে এর অবস্থান নেমে আসে ১৪তম স্থানে।
আয়ের সঙ্গে বদলায় মৃত্যুর কারণ
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গেও মৃত্যুর কারণের ধরনে বড় পার্থক্য রয়েছে। স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে এখনো সংক্রামক রোগই বড় মৃত্যুঝুঁকি। ২০২৩ সালে এসব দেশের শীর্ষ ১০ মৃত্যুর কারণের সাতটিই ছিল সংক্রামক রোগ।
স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে নিম্ন শ্বাসনালীর সংক্রমণ দীর্ঘদিন ধরেই মৃত্যুর প্রধান কারণ। এ ছাড়া ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, এইচআইভি/এইডস ও ডায়রিয়াজনিত রোগও বড় কারণ হিসেবে রয়েছে।
নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চিত্রটি তুলনামূলকভাবে মিশ্র। ২০২৩ সালের শীর্ষ ১০ মৃত্যুর কারণের মধ্যে পাঁচটি ছিল অসংক্রামক রোগ, চারটি ছিল সংক্রামক, মাতৃ, নবজাতক ও পুষ্টিসংক্রান্ত রোগ এবং একটি ছিল আঘাতজনিত কারণ, সড়ক দুর্ঘটনা।
এই শ্রেণির দেশগুলোতে ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ, স্ট্রোক ও সিওপিডিতে মৃত্যুর সংখ্যা ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে ডায়াবেটিসও দ্রুত বেড়েছে। ২০০০ সালে মৃত্যুর কারণের তালিকায় ১৫তম অবস্থানে থাকা ডায়াবেটিস ২০২৩ সালে উঠে এসেছে পঞ্চম স্থানে।
উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অসংক্রামক রোগের আধিপত্য আরও বেশি। ২০২৩ সালের শীর্ষ ১০ মৃত্যুর কারণের আটটিই ছিল অসংক্রামক রোগ। ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই শ্রেণির দেশগুলোতেই কোভিড-১৯ এখনো শীর্ষ ১০ মৃত্যুর কারণের মধ্যে রয়েছে, তবে ২০২১ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় এ রোগে মৃত্যু ৮৫ শতাংশ কমেছে।
উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে শীর্ষ ১০ মৃত্যুর কারণের নয়টিই ছিল অসংক্রামক রোগ। এসব দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্যের কারণে অধিকাংশ প্রধান রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। আলঝেইমার ও অন্যান্য ডিমেনশিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা ২০০০ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ হয়েছে। ২০২৩ সালে এসব রোগ উচ্চ আয়ের দেশগুলোর মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
কেন মৃত্যুর কারণ জানা জরুরি
ডব্লিউএইচও বলছে, মানুষ কেন মারা যায়, তা জানা শুধু মৃত্যুর হিসাব রাখার জন্য নয়। কোন রোগ বা ঝুঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব, কোথায় স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন বেশি এবং কোন পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে, তা নির্ধারণেও এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুর কারণের নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি পরিবহন, খাদ্য ও কৃষি এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রেও নীতি নির্ধারণ করা যায়। বয়স, লিঙ্গ ও ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকির বৈষম্যও চিহ্নিত করা সম্ভব।
ডব্লিউএইচওর ২০২৬ সালের গ্লোবাল হেলথ এস্টিমেটস ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৬০টির বেশি রোগ ও আঘাতের কারণে মৃত্যু এবং রোগের প্রবণতার তথ্য তুলে ধরেছে।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
মতামত