জনপ্রিয় ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নিয়ে নতুন সতর্কবার্তা বিজ্ঞানীদের
ভিটামিন ডি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর একটি জনপ্রিয় সাপ্লিমেন্ট নিয়ে নতুন উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি২ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে শরীরে ভিটামিন ডি৩-এর মাত্রা কমে যেতে পারে। ডি৩ হলো সেই ধরনের ভিটামিন ডি, যা সূর্যালোকের সংস্পর্শে এলে মানবদেহ স্বাভাবিকভাবে তৈরি করে।
গবেষকদের মতে, ভিটামিন ডি২বি ও ডি৩কে দীর্ঘদিন ধরে একই পুষ্টি উপাদানের দুটি বিকল্প উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নতুন প্রমাণ বলছে, এদের কার্যকারিতা এক নয়। বিশেষ করে রক্তে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা বাড়ানো এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ডি৩ তুলনামূলক বেশি কার্যকর।
ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে এবং হাড়কে মজবুত রাখে। পাশাপাশি এটি পেশি, স্নায়ু ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ডি২ ও ডি৩-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট সাধারণত দুটি রূপে পাওয়া যায়—ডি২ (এরগোক্যালসিফেরল) এবং ডি৩ (কোলেক্যালসিফেরল)। ডি২ সাধারণত অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে আনা ছত্রাক বা ইস্ট থেকে তৈরি করা হয়। অন্যদিকে ডি৩ হলো সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মানুষের ত্বকে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হওয়া ভিটামিন ডি।
ঐতিহ্যগতভাবে সাপ্লিমেন্টে ব্যবহৃত ডি৩ ভেড়ার লোম থেকে পাওয়া ল্যানোলিন থেকে তৈরি হলেও বর্তমানে লাইকেনসহ উদ্ভিদভিত্তিক উৎস থেকেও প্রাণিজ উপাদানমুক্ত ডি৩ তৈরি করা হচ্ছে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
ইউনিভার্সিটি অব সারে, জন ইনেস সেন্টার এবং কোয়াডরাম ইনস্টিটিউট বায়োসায়েন্সের গবেষকদের পরিচালিত এবং নিউট্রিশন ভিউজ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ২০টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ১১টি গবেষণার তথ্য মূল বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, যারা ভিটামিন ডি২ গ্রহণ করেছেন তাদের শরীরে ২৫-হাইড্রক্সিভিটামিন ডি৩-এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। বিশ্লেষণ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে এই হ্রাসের পরিমাণ গড়ে প্রতি লিটারে প্রায় ৯ থেকে ১৮ ন্যানোমোল।
তবে গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে ডি২ ক্ষতিকর বা এটি শরীর থেকে ভিটামিন ডি সরিয়ে দেয়। বরং ডি২ নিজেও শরীরে ভিটামিন ডি-এর সামগ্রিক মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এক ধরনের ভিটামিন ডি বাড়লে অন্যটির মাত্রা কমে যাওয়ার বিষয়টি গবেষকদের বিস্মিত করেছে।
কেন ডি২ ডি৩ কমিয়ে দেয়?
এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, শরীরে ভিটামিন ডি নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কারণে এমনটি হতে পারে। ডি২-এর মাত্রা বাড়লে শরীর হয়তো বিদ্যমান ডি৩ দ্রুত ভেঙে ফেলে বা অপসারণ করে দেয়।
গবেষণার প্রধান গবেষক এবং ইউনিভার্সিটি অব সারের পিএইচডি গবেষক এমিলি ব্রাউন বলেন, ‘বিশেষ করে অক্টোবর থেকে মার্চের মধ্যে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা দেখেছি, ভিটামিন ডি২ সাপ্লিমেন্ট শরীরে ডি৩-এর মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে, যা আগে জানা ছিল না। ব্যক্তিগত প্রয়োজন বিবেচনায় অধিকাংশ মানুষের জন্য ডি৩ সাপ্লিমেন্ট বেশি উপকারী হতে পারে।’ আরও পড়ুনআরও পড়ুনফ্যাটি লিভার কি পুরোপুরি ভালো হয়? জানুন সুস্থ রাখার কার্যকর উপায়
রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায়ও ভিন্ন প্রভাব
গবেষণায় আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে ডি২ ও ডি৩ শুধু ভিটামিন ডি-এর মাত্রা বৃদ্ধিতেই নয়, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব সারের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডি৩ শরীরের ‘টাইপ-১ ইন্টারফেরন সিগন্যালিং’ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে পারে, যা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে শরীরের প্রাথমিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে ডি২-এর ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রভাব দেখা যায়নি।
গবেষক কলিন স্মিথ বলেন, ‘ডি৩ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে সক্রিয় করতে পারে। ফলে পর্যাপ্ত ডি৩-এর উপস্থিতি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।’
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব ফলাফল থেকে সরাসরি ডি৩ কোনো নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধ করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও বৃহৎ পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।
তবুও ডি২ অকার্যকর নয়
২০২৬ সালে প্রকাশিত আরেকটি বিশ্লেষণে ২৬টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডি২ সাপ্লিমেন্ট প্যারাথাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কমাতে এবং রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ সামান্য বাড়াতে সক্ষম। অর্থাৎ ডি৩ কমিয়ে দিলেও ডি২-এর নিজস্ব জৈবিক কার্যকারিতা রয়েছে।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, ডি২ ও ডি৩—দুটিই শরীরে ভিটামিন ডি-এর মোট মাত্রা বাড়াতে পারে। তবে অধিকাংশ গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা বাড়িয়ে রাখতে ডি৩ তুলনামূলক বেশি কার্যকর।
গবেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ডি২ ও ডি৩-এর এই জৈব রাসায়নিক পার্থক্য দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যে কতটা প্রভাব ফেলে। এর উত্তর জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র- সাইন্স ডেইলি