ঢাকা    বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
আইন দর্পণ
Topic Ads 1
বিনামূল্যে খতনা করানোর পর ৫০ শিশু অসুস্থ, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ

বিনামূল্যে খতনা করানোর পর ৫০ শিশু অসুস্থ, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ

কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্টমার্টিনে বিনামূল্যে সুন্নতে খতনা করানোর দুই দিনের মধ্যে অন্তত ৫০ শিশুর ক্ষতস্থানে ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ দেখা দিয়েছে। অসুস্থ শিশুদের নিয়ে সকাল থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপ হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনরা। এর মধ্যে মো. ফয়সাল ও আইনুল ইসলাম নামে দুই শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের টেকনাফে রেফার করা হয়েছে। এ ঘটনায় দ্বীপজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৪ অক্টোবর সেন্টমার্টিন অবকাশ রিসোর্টে ‘আল মোমিন সমাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও সুন্নতে খতনা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এমবিবিএস চিকিৎসক মো. আব্দুর রহিম রিফাতের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের মেডিক্যাল টিম ওই কর্মসূচিতে সেন্টমার্টিনের ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী ২১০ শিশুর খতনা করান। পরে শিশুদের বিনামূল্যে ওষুধও দেওয়া হয়। সেন্টমার্টিন হাসপাতাল সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খতনা করানো ৫০ শিশু ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের মধ্যে ফয়সাল ও আইনুল ইসলামের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় টেকনাফে রেফার করা হয়। সেন্টমার্টিন হাসপাতালের উপসহকারী কর্মকর্তা ডা. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খতনা করানো ৫০ শিশু চিকিৎসা নিতে এসেছে। অনেকের ইনফেকশন হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। দুজন শিশুর অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় তাদের টেকনাফে রেফার করা হয়েছে।’ ভুক্তভোগী কয়েকটি পরিবারের স্বজনদের অভিযোগ, খতনা করানোর পর থেকেই শিশুদের ক্ষতস্থানে ব্যথা, ফুলে যাওয়া, পুঁজ ও ইনফেকশনের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে কোনও কোনও শিশুর ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। দ্বীপের বাসিন্দা কবির আহমেদ বলেন, ‘দুই দিন আগে ওই মেডিক্যাল টিমের কাছে আমার ছেলে আইনুল ইসলামকে (৯) খতনা করিয়েছিলাম। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ওষুধও দিয়েছি। এরপর ছেলের এমন অবস্থা দেখে খুব চিন্তিত। ধারণা করছি, হয়তো ভুল চিকিৎসা হয়েছে। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে টেকনাফে রেফার করা হয়েছে। কিন্তু কোনও ট্রলার না পাওয়ায় ছেলেকে টেকনাফের হাসপাতালে নিতে পারছি না।’ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, খতনা করানোর সময় স্বাস্থ্যবিধি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সতর্কতা যথাযথভাবে মানা হয়নি। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিশুকে খতনা করানোর কারণে চিকিৎসাসেবায় অবহেলা হয়ে থাকতে পারে। তবে শিশুদের ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণের সুনির্দিষ্ট কারণ চিকিৎসাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘একটি মেডিক্যাল টিম বিনামূল্যে ২১০ শিশুকে খতনা করায়। এর দুই দিন পর কিছু শিশুর রক্তক্ষরণ দেখা দিয়েছে। তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তবে কী কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তা আমার জানা নেই।’ টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে একটি মেডিক্যাল টিম দুই শতাধিক শিশুকে খতনা করেছে। এর মধ্যে ৫০ শিশু ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তবে মেডিক্যাল টিমের দ্বীপে চিকিৎসাসেবা ক্যাম্প পরিচালনার বিষয়ে আমাদের কেউ অবগত করেনি।’ এ বিষয়ে ওই মেডিক্যাল টিমের প্রধান চিকিৎসক মো. আব্দুর রহিম রিফাতের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও রিসিভ করেননি। দ্বীপের বাসিন্দা শিক্ষক আয়াছ উদ্দিন কাজল বলেন, ‘খতনা করানোর পর অর্ধশতাধিক শিশু রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ, দ্বীপের অধিকাংশ পরিবারই অসচ্ছল। কোনও শিশুর বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিলে তাদের উন্নত চিকিৎসা করানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই শিশুদের অসুস্থতার কারণ কী এবং চিকিৎসায় কোনও ভুল বা অবহেলা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।’ টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘খতনা করানোর পর বেশ কিছু শিশু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কথা শুনেছি। আমি বিষয়টি খোঁজখবর নিচ্ছি। ঘটনায় জড়িত মেডিক্যাল টিমের গাফিলতি পাওয়া গেলে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ স্থানীয়রা বলছেন, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও খতনা কর্মসূচির মতো উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক শিশুকে একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি, জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ও চিকিৎসা-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের অসুস্থতার কারণ নির্ণয়ে ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।