ঢাকা    বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
টেক তরঙ্গ

পেঁয়াজচাষি কাঁদছেন পচনে, দরপতনে

Post Ads 1


পেঁয়াজচাষি কাঁদছেন পচনে, দরপতনে
Post Ads 2
কৃষকের কাছ থেকে কেনার পর পচন ধরা পেঁয়াজ বাছাই করছেন এক ব্যবসায়ী। সম্প্রতি ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর বাজারে। ছবি: আজকের পত্রিকা

বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। এরপরও মজুত করা পেঁয়াজ কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন চাষিরা। দেশে পেঁয়াজের বড় উৎপাদনস্থল পাবনা ও ফরিদপুরেই এখন এই অবস্থা। কারণ হিসেবে চাষিরা বলছেন, মজুত করা পেঁয়াজে পচন ধরার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে সংরক্ষণ পদ্ধতি কাজ না করায় তাঁরা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাওয়ার কারণ হিসেবে হাইব্রিড জাতকে দায়ী করছে কৃষি বিভাগ।

Middle Post Content 1

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫ টন; যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ২৩৯ টন। হাইব্রিড জাতের চাষের কারণেই এ বাড়তি উৎপাদন বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

Middle Post Content 2

জেলার একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা (সাড়ে ৫২ শতক) পেঁয়াজ চাষে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তা থেকে ৮০ থেকে ১০০ মণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু বাজারে কম দাম থাকায় মজুত রাখা হয়, সেই মজুত পেঁয়াজে পচন ধরায় তা দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৭০ মণে। সেই হিসাবে তাঁদের উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রতি মণে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। কিন্তু তাঁদের বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।

Middle Post Content 3

ক্ষোভ প্রকাশ করে সালথা উপজেলার পেঁয়াজচাষি দাউদ মাতুব্বর বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ উৎপাদন খরচই ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। সংরক্ষণ ব্যয় যোগ করলে পুরোপুরি লোকসান গুনতে হচ্ছে।

Middle Post Content 1

আরেক কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, বাজারে যে দাম, তাতে শ্রমিকের মজুরিও ওঠে না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। তাঁরা এখন কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

Middle Post Content 1

ফরিদপুরের কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগে এয়ারফ্লো মেশিন দিলেও বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে পেঁয়াজে পচন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া জেলার অধিকাংশ পেঁয়াজচাষি প্রাচীন চাঙ (মাচা) পদ্ধতিতেও সংরক্ষণ রাখলেও সেখানেও পচন দেখা দিয়েছে।

Middle Post Content 1

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় পেঁয়াজচাষিদের ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়। এ বছর আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি মেশিনে ১০ টন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায়।

Middle Post Content 1

চাষিদের অভিযোগ, সরকারিভাবে দেওয়া এয়ারফ্লো মেশিন অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। তাঁরা বলছেন, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ থাকে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। বিদ্যুৎ না থাকলে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে পচনের ঘটনা বাড়ছে।

Middle Post Content 1

সালথা উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, সরকারি এয়ারফ্লো মেশিন ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় প্রায় ৩৫০ মণ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে সেগুলো পুকুরে ফেলে দিয়েছেন তিনি।

Middle Post Content 1

আটঘর ইউনিয়নের খোয়াড় গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মাফিকুল ইসলাম জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ারফ্লো মেশিন সার্বক্ষণিক চালু থাকার দরকার। কিন্তু সম্প্রতি বিদ্যুতের লোডশেডিং যে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে তাতে ওই যন্ত্রগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না।

Middle Post Content 1

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) মো. শাহাদুজ্জামান জানান, এয়ারফ্লো মেশিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একনাগাড়ে তিন-চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রবাহ নিশ্চিত করার পর এ ঘণ্টা বন্ধ রাখা। আধুনিক যে মেশিনগুলো সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলো সময় ঠিক করে অটো সেন্সর যুক্ত করা। বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা এ মেশিনের কার্যকারিতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে তিনি জানান।

Middle Post Content 1

বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের বিষয়ে ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এস এম নাসিরউদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে বিদ্যুতের ভয়ংকর লোডশেডিং আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। দিনে টানা তিন বা চার ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ আমরা সরবরাহ করতে পারিনি।’ তবে সামনে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Middle Post Content 1

গতকাল বৃহস্পতিবার বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে বিক্রির জন্য চাষিদের নিয়ে আসা বেশির ভাগ পেঁয়াজ হাইব্রিড জাতের। অতিরিক্ত গরম আর সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেগুলোতে পচন ধরেছে বলে জানান একাধিক চাষি। এ ছাড়া অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের কারণে দেশি পেঁয়াজও বড় হয়েছে এবং তাতে পানি বেশি থাকায় পচন ধরছে মনে করেন পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন।

Middle Post Content 1

এসব বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ফরিদপুরের জ্যেষ্ঠ কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সাহাদাত হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, পেঁয়াজ কত দিন সংরক্ষণ করা যাবে তা নির্ভর করে পেঁয়াজের জাতের ওপর। এবার পেঁয়াজের জাতের কারণে আকার বড় হয়েছে, যা বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না। তা ছাড়া পেঁয়াজ উত্তোলনের সময় বৃষ্টিপাতের কারণে পানির উপস্থিতি বেশি ছিল। ফলে সংরক্ষণ করতে সমস্যা হচ্ছে।

Middle Post Content 1

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, চলতি বছর পেঁয়াজের আকার স্বাভাবিক পেঁয়াজের তুলনায় বড় হয়েছে। পেঁয়াজ বড় হলে তাতে স্বাভাবিকভাবেই পানির পরিমাণ বেশি থাকে, আর পানির পরিমাণ বেশি হলে তার সংরক্ষণক্ষমতাও কম থাকে। সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়ালে পচন থেকে কৃষকেরা রক্ষা পাবে। এ জন্য সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজন।

Middle Post Content 1

গত বুধবার পাবনার বড় বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মমিন হোসেন বলেন, বর্তমানে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে। খুচরা বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি কেজি পেঁয়াজ খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। মাসখানেক আগে ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

Middle Post Content 1

চাটমোহর উপজেলার ভাদড়া গ্রামের পেঁয়াজচাষি হাসু প্রামাণিক বলেন, তিনি ২ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। মাসখানেক আগে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ বিক্রি করেছেন। কিন্তু বর্তমানে সেই পেঁয়াজ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে বাজারে বিক্রি করছেন।

Middle Post Content 1

সাঁথিয়া উপজেলার কোনাবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আবদুল লতিফ জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে না পারায় বাধ্য হয়ে ঘরে রাখা পেঁয়াজ ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরাও দাম কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

Middle Post Content 1

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) রাফিউল ইসলাম বলেন, জেলায় পেঁয়াজচাষি আছেন লক্ষাধিক। সেখানে পেঁয়াজ সংরক্ষণ পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে মাত্র আড়াই হাজার কৃষককে। বেশির ভাগ কৃষক নিজেদের মতো করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। নষ্ট হওয়ার উপক্রম হলে কৃষক তখন পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন।

Middle Post Content 1

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর পাবনা জেলায় ৫৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয় ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে। আর ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৩ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৩৬৭ টন।

Middle Post Content 1

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন ফরিদপুর, পাবনা, চাটমোহর ও সাঁথিয়া প্রতিনিধি]

বিষয় : পেঁয়াজ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ছাপা সংস্করণ শেষ পাতা উৎপাদন বাজার

Post Ads 3
0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Post Ads 4
টেক তরঙ্গ

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পেঁয়াজচাষি কাঁদছেন পচনে, দরপতনে

প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। এরপরও মজুত করা পেঁয়াজ কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন চাষিরা। দেশে পেঁয়াজের বড় উৎপাদনস্থল পাবনা ও ফরিদপুরেই এখন এই অবস্থা। কারণ হিসেবে চাষিরা বলছেন, মজুত করা পেঁয়াজে পচন ধরার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে সংরক্ষণ পদ্ধতি কাজ না করায় তাঁরা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাওয়ার কারণ হিসেবে হাইব্রিড জাতকে দায়ী করছে কৃষি বিভাগ।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫ টন; যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ২৩৯ টন। হাইব্রিড জাতের চাষের কারণেই এ বাড়তি উৎপাদন বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

জেলার একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা (সাড়ে ৫২ শতক) পেঁয়াজ চাষে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তা থেকে ৮০ থেকে ১০০ মণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু বাজারে কম দাম থাকায় মজুত রাখা হয়, সেই মজুত পেঁয়াজে পচন ধরায় তা দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৭০ মণে। সেই হিসাবে তাঁদের উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রতি মণে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। কিন্তু তাঁদের বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।

ক্ষোভ প্রকাশ করে সালথা উপজেলার পেঁয়াজচাষি দাউদ মাতুব্বর বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ উৎপাদন খরচই ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। সংরক্ষণ ব্যয় যোগ করলে পুরোপুরি লোকসান গুনতে হচ্ছে।

আরেক কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, বাজারে যে দাম, তাতে শ্রমিকের মজুরিও ওঠে না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। তাঁরা এখন কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

ফরিদপুরের কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগে এয়ারফ্লো মেশিন দিলেও বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে পেঁয়াজে পচন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া জেলার অধিকাংশ পেঁয়াজচাষি প্রাচীন চাঙ (মাচা) পদ্ধতিতেও সংরক্ষণ রাখলেও সেখানেও পচন দেখা দিয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় পেঁয়াজচাষিদের ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়। এ বছর আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি মেশিনে ১০ টন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায়।

চাষিদের অভিযোগ, সরকারিভাবে দেওয়া এয়ারফ্লো মেশিন অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। তাঁরা বলছেন, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ থাকে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। বিদ্যুৎ না থাকলে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে পচনের ঘটনা বাড়ছে।

সালথা উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, সরকারি এয়ারফ্লো মেশিন ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় প্রায় ৩৫০ মণ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে সেগুলো পুকুরে ফেলে দিয়েছেন তিনি।

আটঘর ইউনিয়নের খোয়াড় গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মাফিকুল ইসলাম জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ারফ্লো মেশিন সার্বক্ষণিক চালু থাকার দরকার। কিন্তু সম্প্রতি বিদ্যুতের লোডশেডিং যে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে তাতে ওই যন্ত্রগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) মো. শাহাদুজ্জামান জানান, এয়ারফ্লো মেশিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একনাগাড়ে তিন-চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রবাহ নিশ্চিত করার পর এ ঘণ্টা বন্ধ রাখা। আধুনিক যে মেশিনগুলো সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলো সময় ঠিক করে অটো সেন্সর যুক্ত করা। বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা এ মেশিনের কার্যকারিতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে তিনি জানান।

বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের বিষয়ে ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এস এম নাসিরউদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে বিদ্যুতের ভয়ংকর লোডশেডিং আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। দিনে টানা তিন বা চার ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ আমরা সরবরাহ করতে পারিনি।’ তবে সামনে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে বিক্রির জন্য চাষিদের নিয়ে আসা বেশির ভাগ পেঁয়াজ হাইব্রিড জাতের। অতিরিক্ত গরম আর সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেগুলোতে পচন ধরেছে বলে জানান একাধিক চাষি। এ ছাড়া অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের কারণে দেশি পেঁয়াজও বড় হয়েছে এবং তাতে পানি বেশি থাকায় পচন ধরছে মনে করেন পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন।

এসব বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ফরিদপুরের জ্যেষ্ঠ কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সাহাদাত হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, পেঁয়াজ কত দিন সংরক্ষণ করা যাবে তা নির্ভর করে পেঁয়াজের জাতের ওপর। এবার পেঁয়াজের জাতের কারণে আকার বড় হয়েছে, যা বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না। তা ছাড়া পেঁয়াজ উত্তোলনের সময় বৃষ্টিপাতের কারণে পানির উপস্থিতি বেশি ছিল। ফলে সংরক্ষণ করতে সমস্যা হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, চলতি বছর পেঁয়াজের আকার স্বাভাবিক পেঁয়াজের তুলনায় বড় হয়েছে। পেঁয়াজ বড় হলে তাতে স্বাভাবিকভাবেই পানির পরিমাণ বেশি থাকে, আর পানির পরিমাণ বেশি হলে তার সংরক্ষণক্ষমতাও কম থাকে। সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়ালে পচন থেকে কৃষকেরা রক্ষা পাবে। এ জন্য সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজন।

গত বুধবার পাবনার বড় বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মমিন হোসেন বলেন, বর্তমানে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে। খুচরা বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি কেজি পেঁয়াজ খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। মাসখানেক আগে ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

চাটমোহর উপজেলার ভাদড়া গ্রামের পেঁয়াজচাষি হাসু প্রামাণিক বলেন, তিনি ২ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। মাসখানেক আগে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ বিক্রি করেছেন। কিন্তু বর্তমানে সেই পেঁয়াজ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে বাজারে বিক্রি করছেন।

সাঁথিয়া উপজেলার কোনাবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আবদুল লতিফ জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে না পারায় বাধ্য হয়ে ঘরে রাখা পেঁয়াজ ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরাও দাম কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) রাফিউল ইসলাম বলেন, জেলায় পেঁয়াজচাষি আছেন লক্ষাধিক। সেখানে পেঁয়াজ সংরক্ষণ পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে মাত্র আড়াই হাজার কৃষককে। বেশির ভাগ কৃষক নিজেদের মতো করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। নষ্ট হওয়ার উপক্রম হলে কৃষক তখন পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর পাবনা জেলায় ৫৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয় ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে। আর ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৩ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৩৬৭ টন।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন ফরিদপুর, পাবনা, চাটমোহর ও সাঁথিয়া প্রতিনিধি]


টেক তরঙ্গ

সম্পাদক ও প্রকাশক: আত্রাই বার্তা

কপিরাইট © ২০২৬ টেক তরঙ্গ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
পেঁয়াজচাষি কাঁদছেন পচনে, দরপতনে
0:00 0:00
1.0x